পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৮

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা : ৪

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা

পাতা: ৪


ঘটনা প্রবাহ
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে মুক্ত আলোচনা
গত ২১ শে মার্চ ’৯২ আন্তর্জাতিক বর্ণবাদ বিরোধী দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় গণউন্নয়ন গ্রন্থ কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সম্পর্কে এক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাপ্তাহিক “দেশদশ” এই মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। মানবাধিকার কর্মী ফাদার আর, ডব্লিউ, টিম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভার শুরুতে বিশিষ্ট সাংবাদিক চিম্ময় মুসুদ্দী পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা বিষয়ক তার একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। তারপর আলোচনায় অংশ নেন যথাক্রমে রাশেদ খান মেনন এম, পি, (ওয়ার্কার্স পার্টি): জনাব কর্ণেল (অবঃ) আকবর হোসেন এম,পি,(বিএনপি); তোফায়েল আহমদ এম,পি,(আওয়ামী লীগ); দীপংকর তালুকদার এম,পি, (আওয়ামী লীগ); চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, পাহাড়ি গণ পরিষদ সভাপতি বাবু সুবোধ বিকাশ চাকমা, সাবেক ছাত্র নেতা মোস্তফা ফারুক, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক সালিম সামাদ।
আলোচকগণের মধ্যে কর্ণেল (অবঃ) আকবর হোসেন ব্যতীত সকলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা বলে স্বীকৃতি দেন এবং রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান। বক্তাগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে সামরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করায় সমস্যা আরো জটিল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। কর্ণেল (অবঃ) আকবর হোসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে মূলতঃ অর্থনৈতিক এবং আইন শৃংখলা জনিত সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। সভাপতির ভাষণে ফাদার টিম পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘুদের জমি জবর দখলের প্রক্রিয়া রোধ করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা হাতে নেয়ার আহ্বান জানান। সভা শেষে “দেশদশ” পত্রিকার সম্পাদক জনাব ফারুক ফয়সাল একটি প্রস্তাবনা পেশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দাবী দেশে যেহেতু সার্বভৌম সংসদ রয়েছে, অতএব এই সমস্যা সংসদে উপস্থাপন করা হোক এবং সংসদীয় পদ্ধতিতেই এই সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া হোক।  
------------------------
বেশ কয়েকটি আটকাদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ  
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির শিকার হয়ে দীর্ঘ দিন যাব বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক প্রায় ৪২ জন পাহাড়ি বন্দীর আটকাদেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্টে রীট আবেদন পেশ করা হয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় হতে এই রীট আবেদন শুরু হয়। আন্তার্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ব্যারিষ্টার আমীরুল ইসলাম ও এডভোকেট নাসিমসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী পিটিশনারদের পক্ষ হয়ে রীট আবেদনগুলো পরিচালনা করছেন।
এযাব মোট ২৬টি রীট পিটিশনের রায় বের হয়েছে এবং সব কয়েকটি আটকাদেশ অবৈধ বলে মহামান্য হাইকোর্ট রায় প্রদান করেছেন। এই রায় সমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “যে মড়ঁহফ -এর ভিত্তিতে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এই আদেশ প্রদান করেছেন তা অবৈধ এবং এই অবৈধ আটকাদেশ বর্ধিত করাও অবৈধ। ঢাকায় অধ্যয়নরত পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে পিটিশনার হয়ে এই রীট আবেদনগুলো দাখিল করেছেন।                             --------------------------

CHT কমিশনের Update Report প্রকাশিত 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন সম্প্রতি তাদের মূল রিপোর্ট " Life is not Ours "-এর  Update Edition প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে যে, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি। কমিশন অভিযোগ করেছে যে, এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে আগের মতই হত্যা, ধর্ষণ, ভূমি বেদখল, অনুপ্রবেশ, শারীরিক নির্যাতন, ধর্মীয় পরিহানি ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কাজ চলছে। কমিশনের এই Update রিপোর্ট -এ মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন ঘটনা সচিত্র উল্লেখ পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের সুপারিশ সমূহ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের শেষার্ধে ভারতের ত্রিপুরার শরণার্থী শিবির এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের পর CHT কমিশন ১৯৯১ সালের মে মাসে তাদের রিপোর্ট "Life Is Not Ours, Land and Human Rights in Chittsgong Hill Tracts, Bangladesh" প্রকাশ করে।  

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা: ৫ - ১৪

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা

পাতা: ৫ - ১৪

মানবাধিকার
অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম
                   মানবাধিকার লংঘনের শেষ কোথায়?                                                       ...............................................................

[এক ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছে। ক্ষমতায় আসীন হয়েছে বহুল কথিত একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। তারপর এক বসরাধিক কাল অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু তবুও পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। জেল-জুলুম, হত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মীয় পরিহানি ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ আগের মতোই বর্তমান কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও অহরহ ঘটে চলেছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লংঘনের খবরগুলো এই কলামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি- সম্পাদনা পরিষদ]                 

দীঘিনালা
(১)
ভি, ডি, পি, কর্তৃক প্রহৃত      
১২ই ডিসেম্বর ১৯৯১ ইং, বৃহস্পতিবার। তখন সন্ধ্যে প্রায় সাতটা। “শান্তি নিবাস” নামক গুচ্ছগ্রামবাসী মিঃ মণি চাকমা তার বন্ধু মিঃ সুকুমার চাকমার বাড়ী থেকে ফিরছিলেন। পথে টহলরত দীপায়ন চাকমা নামক জনৈক ভি,ডি,পি গু-া ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তাকে আটক করে ও অযথা হয়রানিমূলক নানা জিজ্ঞাসাবাদ করে। ভিডিপি গু-ারা মনি চাকমাকে শান্তিবাহিনীর সহযোগী সন্দেহে বেদম প্রহার করে ও মিঃ ক্রিনটেন্দ্র -এর দোকানের খুটিতে উলঙ্গ অবস্থায় সারা রাত বেঁধে রাখে। পরের দিন তাকে এই শর্তে ছেড়ে দেয়া হয় যে, (১) সে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গুচ্ছগ্রামের বাইরে যাবে না, (২) সে শান্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ রাখবে না, (৩) সে তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং (৪) সে পরবর্তী দশদিন ধরে ভিডিপি ক্যাম্পে হাজিরা দেবে।                                                                              উল্লেখ্য মিঃ মনি চাকমার পিতা ভেজাল্যা চাকমাকে এক বছর আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক করা হয় এবং তিনি এখনো খাগড়াছড়ি জেলে অন্তরীণ আছেন।  
জানা গেছে সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট এই তথাকথিত ভিডিপি আঙ্গুলবাহিনী আখ্যাত গ্রাম্য মস্তানদের উপাতে গুচ্ছগ্রামবাসীদের জীবন বর্তমানে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। একে খাদ্য সংকট, অসুখ-বিসুখ ও নিয়ন্ত্রিত জীবন; তার উপর এই ভিডিপি ও আঙ্গুলবাহিনী নামক গু-াদের দৌরাত্ম্য- গুচ্ছগ্রামবাসীদের যেন মরার উপর খারার ঘা।

(২)
বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ : দুইজন প্রহৃত 
গত ১৩/১২/৯১ইং বাবুছড়া সাব-জোন কমা-ার মেজর নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী দিঘীনালা উপজেলার হংসজয় কার্বারি পাড়ায় হানা দেয়। তারা তিন ব্যক্তির ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং অন্য দুই জনের বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়। যাদের বাড়ীগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় তারা হলেন (১) ভারতচন্দ্র চাকমা, পিতা হিরণ মোহন চাকমা এবং (২) ভারতমনি চাকমা পিতা উদয়মনি চাকমা। তাছাড়া, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে জটিলা চাকমা পিং বাঙাল্যা চাকমা, জগদীশ মনি চাকমা ও বাচ্যু মনি চাকমা নামে তিনজন নিরীহ ব্যক্তিকে অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত বেদম প্রহার করে।                    
জানা গেছে, বাবুছড়ায় অবস্থিত শান্তিনিবাস গুচ্ছগ্রাম নিবাসী মিঃ সুজেন্দ্র চাকমার পুত্র মিঃ বাচ্যুমনি চাকমাকে সেনা সদস্যরা পথ প্রদর্শক হিসাবে সেখান থেকে জোরপূর্বক নিয়ে গিয়েছিল।

(৩)
সেনাবাহিনী কর্তৃক কিশোরী ধর্ষিতা 
২২/১২/৯১ইং রবিবার, বৌদ্ধপাড়া গ্রাম দিঘীনালা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সড়ক টহলদান সেনাবাহিনীর প্রাত্যহিক কাজ। ঐ দিন টহলদানরত আলীগড় টিলা ক্যাম্প কমা-ার (৮ম বেঙ্গল রেজি) তার চার জন সৈন্যসহ দুপুর একটার সময় টহল পোষ্টের অনতিদূরে বৌদ্ধপাড়া গ্রামে যায় এবং মিঃ রতন কুমার ত্রিপুরার ১৯ বছরের সুন্দরী কিশোরী কন্যা অঞ্জলী ত্রিপুরাকে বলপূর্বক উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। উক্ত ঘটনার পর এলাকায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক চাপা ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বর্বরোচিত ঘটনার যথার্থ বিচার পাওয়ার কোন উপায় না দেখে এলাকাবাসীরা ক্ষোভে-দুঃখে শুধু অশ্রুপাত করতে থাকে।

(৪)
সেনাবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ি গ্রামে হানা, বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ   
২২/১২/৯১ইং, রোজ রবিবার, দুপুর ২টা। ঐ দিন পানছড়ি জোন-এর একদল আর্মি বাবুছড়া ইউনিয়নের শুকনাছড়ি গ্রামে অতর্কিত হানা দেয় এবং গ্রামবাসীদের উপর বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে। ঐ সময় গ্রামবাসীরা প্রাণের ভয়ে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে এবং অনেকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নিতে সমর্থ হয়। উক্ত ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। কারণ ঐ এলাকাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তবে পালিয়ে আসা একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেনাবাহিনীরা সারা গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৯ জনের বাড়ি-ঘর ভস্মিভূত হওয়ার খবর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তারা হলেনÑ (১) অক্ষয় চন্দ্র চাকমা পিতা চুচ্যাং চাকমা, (২) জুক্যা চাকমা পিতা মধুচন্দ্র চাকমা, (৩) দিল্লীজয় চাকমা পিতা Ñ জানা যায় নি, (৪) মিত্রময় চাকমা পিতা Ñ উত্তুচ্যা চাকমা, (৫) বীরকর চাকমা পিতা মিত্রজয় চাকমা, (৬) প্রভাতচন্দ্র চাকমা পিতা জমাদিরন চাকমা (৭) জচিন্যা চাকমা পিতা রাঙ্যা চাকমা, (৮) বীরসেন চাকমা পিতা রাঙ্যা চাকমা এবং (৯) যুধিষ্টির চাকমা পিতা অজানা চাকমা।

(৫)
সাইকেল চালানোর জন্য দশম শ্রেণীর ছাত্র প্রহৃত
২৩ শে ডিসেম্বর ১৯৯১ ইং। “শান্তিনিবাস” গুচ্ছগ্রাম ও বাজারের পরিচালক লেন্স নায়েব বেলায়েত দশম শ্রেণীর ছাত্র ইরিস কান্তি চাকমাকে বিনা কারণে বেদম প্রহার করে। জানা গেছে, “শান্তিনিবাস” গুচ্ছগ্রামবাসী বিমল কান্তি বাপের ছেলে মিঃ ইরিস কান্তিকে গুচ্ছগ্রাম এলাকার বাইরে সাইকেলে চড়ায় জনাব বেলায়েত কোন জিজ্ঞাসাবাদ না করে অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত তাকে নাকে মুখে বেপরোয়াভাবে কিলঘুষি লাঠি মারতে থাকে।

(৬)
এক বছরের শিশু সোহেল-এর কি অপরাধ ? 
পার্বত্য চট্টগ্রামের দশ ভিন্ন ভাষাভাষী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার-নির্যাতন পৃথিবীর সমস্ত বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মায়ের কোলের ছোট ছোট শিশুরাও এই বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত ৬/১/৯২ ইং শান্তিপুর গ্রামের জাঙ্গাল্যা চাকমার এক বছরের শিশুপুত্র সোহেল চাকমাকে সেনাবাহিনীর জনৈক সদস্য তার মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে লাঠি মারে এবং আছার দেয়। এর ফলে শিশুটি প্রায় আট ঘন্টার মতো অচেতন অবস্থায় থাকে।

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা: ১৫

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা

পাতা: ১৫

আর, এস, ও এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী কর্তৃক
যৌথভাবে পাহাড়ি গ্রামে হামলা

গত ১২ইং ফেব্রুয়ারী ’৯২ তারিখ রাত ১০টার দিকে বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাধীন সোনাইছড়ি ইউনিয়নের রেজু মৌজার চুলাপাড়ায় (প্রোত্তংথি রোয়া) কমপক্ষে ৪০ জনের বার্মার আরাকানের একদল সশস্ত্র মুসলিম মৌলবাদী R.S.O. (Rohingya Solidarity Organization) ARIF(Arakan Rohingya Islamic Front) এবং কিছু সংখ্যক স্থানীয় মৌলবাদী দুষ্কৃতিকারীদের সহায়তায় ১১টি সংখ্যালঘু চাক পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে সর্বসহায় সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়। হামলা চালানো কালে দুষ্কৃতিকারীরা নিরীহ গ্রামবাসীদেরকে শারীরিক অমানুষিক নির্যাতন করে এবং মহিলাদেরকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। উক্ত গ্রামের আক্রান্ত পরিবারের পুরুষদেরকে ঘরের বাইরে নিয়ে অমানুষিক শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং মহিলাদেরকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করা হয়। দুস্কৃতিকারীদের দ্বারা আক্রান্তদের নাম নি¤œ দেয়া হলো-
১)   ওয়ে থোঁয়ে ও (বয়স-৩০ বসর) - তাকে শারীরিকভাবে অমানুষিক মারধোর করা হয়। তার স্ত্রী ডমে নিন (২৭) কে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করা হয়।
২)   হং শোয়ে হ্লা- তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং তার স্ত্রী ছো মা হ্রীকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করা হয়।
৩)   মং ছা অং (৪০) -তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তার বৃদ্ধা মা থাউকে (৮০) মারধোর করা হয় এবং স্ত্রীকেও নির্যাতন করা হয়।
৪)   ছা ফ্রু অং (৯০) -এই অশিতিপর বৃদ্ধাকে নির্যাতন করা হয়। তার মেয়ে নাং চিং গুকে মারধোর করা হয় এবং তার অবিবাহিতা নাতনী চিং রাখাইনকে (২৫) দুস্কৃতিকারীরা পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে।
৫)   তেজেন্দ্র বড়–য়া (ক্রামং) - তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং তার স্ত্রী হ্রা মো তুকে পলাক্রমে ধর্ষণ করে।
৬)   অং থোঁয়ে চিং (২৭) - তাকে শারীরিকভাবে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং তার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়।
৭)   আলুং (৪০) - তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তার স্ত্রী তা ধা ওয়ানকে (৩৫) ধর্ষণের জন্য ঝাপিয়ে ধরলে তার শিশু পুত্রটি চিকার করে তখন দুস্কৃতিকারীরা শিশুটিকে দা দিয়ে আঘাত করলে শিশুটি আহত হয় এবং তা ধা ওয়ানের মাথা কেটে যায়।
৮)   মা রেইন নু (১১) - তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।
৯)   হ্লো অং (২৮) - দুস্কৃতিকারীরা তার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়।
১০) হ্রা মো ছু (৪৫) - দুস্কৃতিকারীরা তাকে ধর্ষণ করে এবং তার স্বামীকে অমানুষিক নির্যাতন করে।
১১) উ মে ছিং (২৭) - স্বামী উ ওয়ে ডো - দুস্কৃতিকারীরা তাদেরকে অমানুষিক নির্যাতন করে এবং সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়।
১২) মা ঞেন্ট (৩০) - দুস্কৃতিকারীরা তার স্বামীকে অমনুষিক নির্যাতন করে এবং তাকে পর্যায় ক্রমে ধর্ষণ করা হয়।
১৩) উমং (৪০) - দুস্কৃতিকারীদের হাত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার নববিবাহিতা কন্যা মা না গুয়েকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করা করা হয়।
দুস্কৃতিকারীরা তাদের পাশবিকতা চরিতার্থ করে চলে যাবার সময় নির্যাতিতদেরকে বার্মা চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে যায়। বাংলাদেশ ছেড়ে না গেলে পরবর্তীতে তাদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়ে যায়।
এই ঘটনার সময় গ্রামের নিকটতম পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দিলে অসময়ে যেতে পারবে না বলে ফিরিয়ে দেয়। তবে দুস্কৃতিকারীরা চলে যাবার ৪ ঘন্টা পর একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। অপর দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি বি.ডি.আর ক্যাম্পে গিয়ে আক্রান্ত গ্রামবাসীরা নিরাপত্তার প্রার্থনা জানালে বি.ডি.আর Ñএর মেজর সাহেব তাদেরকে অন্যত্র চলে যেতে পরামর্শ দেন। অন্যথায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। উক্ত গ্রামের পাহাড়িরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।                      বর্তমানে বান্দরবান ও কক্সবাজার এলাকায় বার্মা থেকে আগত রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী ও স্থানীয় মৌলবাদীরা সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক হীন চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। অত্র এলাকায় এখন সংখ্যালঘুদের জান মালের নিরাপত্তার অভাব বিরাজমান। এ মুহুর্তে সরকারের উচিত সেখানকার স্থানীয় সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা।                                                                                                                                                                                      - হারবাং প্রতিনিধি কর্তৃক প্রেরিত।

-------------------------------------

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা: ১৫

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা


পাতা: ১৫


সন্ত্রাসকারীরা চিহ্নিত, নামমাত্র শাস্তি ভোগ
ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকের ঘটনা। লংগদু বাজারের কাঁচা তরকারী বিক্রি করতে আসে এক সহজ সরল নিরীহ পাহাড়ি। হঠা সে ঠাহ্র পায়, তার থুপড়ীতে একজন সৈনিক কি যেন রেখে দিচ্ছে। পরে সে চিনতে পেরে “বোমা বোমা” বলে চিকার করতে থাকে। হাতেনাতে ধরা পড়ার পর অফিসার সৈনিকটিকে শাস্তিস্বরূপ কানে ধরে উঠাবসা করান। অথচ ধরা না পড়লে কী যে হতো তা বলার দরকার নেই। পরদিন এ দেশের দৈনিক, সাপ্তাহিকীতে বড় বড় হেডিং-এ খবর আসতো ‘সন্ত্রাসবাদী শান্তিবাহিনীর বোমা বিস্ফোরণে ........জন নিহত’ ইত্যাদি ইত্যাদি। উল্লেখ্য এই একই কায়দায় ২রা ফেব্রুয়ারী লংগদুতে লঞ্চ বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। অথচ দোষ পড়েছিল শান্তিবাহিনীর ওপর। আসলে সেনাবাহিনীরাই বর্তমানে এভাবে শান্তিবাহিনীদের নাম দিয়ে নিজেরাই সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এটা এখন পরিস্কার যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসল সন্ত্রাসবাদী কারা। কারা এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখতে চায়। কারা যখন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয় তখন এসব বোমাবাজি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হত্যা ঘটায়।                 

                                                  - বরকল থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা: ১৬ - ১৭

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা

পাতা: ১৬ - ১৭


চা ল চি ত্র

সমীরণের স্বপ্ন  
তথাকথিত খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কুখ্যাত দালাল সমীরণ দেওয়ান এখন বিদেশে রাষ্ট্রদূত হবার স্বপ্নে বিভোর। ব্রিগেডিয়ার ইব্রাহীম নাকি তাকে কথা দিয়েছিলেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানশীপ চলে গেলে তাকে বিদেশে রাষ্ট্রদূত বানিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সমীরণ নাকি এখন মহা ভাবনায় আছেন, পাছে তাকে ফিলিফাইনে রাষ্ট্রদূত বানিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারণ এখানে নাকি কমিউনিষ্ট বিদ্রোহিদের শক্তি খুব বেশী।
-------------------------------------
গৌতমের একটি ধাপ                                                                                                            তথাকথিত রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান শৃগালের ন্যায় ধূর্ত। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হবার পর তিনি বরাবরই বলতে থাকেন যে জেলা পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের একটি “ধাপ” মাত্র, চূড়ান্ত সমাধান নয়। এটা বলে তিনি দু’কূল রক্ষা করার চেষ্টা করেন। প্রথমতঃ জেলা পরিষদের যারা বিরোধী তাদেরকে বুঝাতে চান যে তিনিও এটাতে তৃপ্ত নন। অন্যদিকে সরকারকে বুঝাতে চান যে, তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আরো একটু বাড়িয়ে দিলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। অথচ তিনি “স্বায়ত্তশাসন” প্রয়োজন মনে করেন না। গৌতমের এই ধূর্তামী প্রসঙ্গে রসিকজনেরা বলেন, গৌতমের এসব নাকি গর্বাচেভীয় কায়দায় রাজনীতি।                                                                                                                                   
------------------------------------
জেরীর মহানুভবতা                                                                                                               
বান্দরবান পার্বত্য জেলা চেয়ারম্যান চাচিংপ্রু জেরী এই তথাকথিত জেলা পরিষদের ইতিহাসে একটা চমক সৃষ্টি করতে চান। সরকার প্রচার করে থাকেন যে, পাহাড়িদের বেলায় চাকুরীর ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা একধাপ শিথিলযোগ্য (যদিও বাস্তব বড়ই কঠিন)। জেরী মনে করেন এটা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অ-পাহাড়িদের প্রতি একটা বৈষম্য। তাই তিনি বিশেষ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লিখেন এই দাবী করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অ-পাহাড়িদের ক্ষেত্রেও চাকুরীর ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা একধাপ শিথিল করতে হবে। বিশেষ মন্ত্রণালয় তার এই দাবী কতটুকু আমল দিয়েছেন জানা যায়নি। কিন্তু এখন জেরী সাহেব সুযোগ মত অ-পাহাড়িদের বলেন, “দেখ আমি তোমাদের কত মহানুভবতা দেখিয়েছি। সুতরাং আগামী নির্বাচনে আবার........”                    
-----------------------------------------
সমীরণের গাড়ির বাহার                                           
সমীরণের পাজেরো গাড়িটি একদা খাগড়াছড়ি বাজার ট্রাফিক জামে আটকা পড়ে। এমন সময় আরো কয়েকটি সম-মানের পাজেরো গাড়ি তার গাড়িটির আশে-পাশে এসে থামে। তখন সমীরণ ড্রাইভারের কাছে জিজ্ঞাসা করেন “এখানে থামানো পাজেরোর মধ্যে কোনটা বেশী ভালো?” ড্রাইভার প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য বলে, “স্যার আপনারটা”। সমীরণ পিকপিক করে হেসে বলেন, “ঠিক বলেছ। ঐগুলো বাজে, দাম বেশী হলে ১২/১৪ লাখ হবে Ñ আমারটা তো ২৫ লাখ।”                                    
-----------------------------------------
দালালদের পদত্যাগ কর্মসূচী                                     
পাহাড়ি গণ পরিষদ ও ছাত্র পরিষদসহ সর্বস্তরের জনগণ যখন গণধিকৃত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রকৃত রাজনেতিক সমাধানের দাবী জানাচ্ছে, তখনই তিন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করার হীন কৌশল অবলম্বন করে। এরই অংশ হিসেবে ৭/১১/৯১ইং তিন চেয়ারম্যান এক যুক্ত ঘোষণায় তথাকথিত ১১ দফা দাবী ঘোষণা করে। সেখানে জেলা পরিষদের ২২টি বিষয় হস্তান্তরের দাবী ছাড়াও আরো কিছু শ্রুতিমধুর দাবী ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এই দাবী পূরণের জন্য সরকারকে ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় সীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছিল, অন্যথায় পদত্যাগ। সময়সীমা অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তিন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এখনো ..........।                    
-----------------------------------------
নন্দিতের গুলিবিদ্ধ হবার নাটক                                               
গত ২২শে ফেব্রুয়ারি ’৯২ নন্দিত নামের এক আত্মসমর্পনকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে যান। গুলিবিদ্ধ হবার পর নন্দিত যখন হাসপাতালের জরুরী চিকিসায় রয়েছেন, তখন জনৈক জেলা পরিষদ সদস্য মন্তব্য করেন, “পিস্তলটা এখন পূর্ণজ্যোতির বাসা তল্লাশী করলে পাওয়া যাবে।” এই পূর্ণজ্যোতিও একজন জেলা পরিষদ মেম্বার, যার নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক রয়েছে এবং অনেক সময় আর্মির পোশাক পড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে অপারেশনে গিয়ে নিরীহ লোক ধরে নিয়ে আসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।            
----------------------------------------
কুখ্যাত হেডম্যান দীপংকরের কারসাজী              
দীঘিনালার কুখ্যাত হেডম্যান দীপংকরের দৌরাত্ম্যে দীঘিনালার নিরীহ জনসাধারণ অতিষ্ঠ। তিনি এখন একটা চমকার ব্যবসা আরম্ভ করেছেন। ব্যবসাটা হলো নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের হাতে যে কোন নিরীহ লোককে “শান্তিবাহিনী” বলে ধরিয়ে দেয়া এবং গ্রেফতারকৃতদের ছাড়িয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ (যা ৫০ হাজার টাকার নীচে নয়) আদায় করা। যারা এই মোটা অংকের ঘুষ দিতে না পারবেন তারা রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর শ্রীঘরে থাকবেন। এই অংক তার সাথে গ্রেফতারকারীর আনুপাতিক হারে ভাগ হয়। তার এই পুঁজি ছাড়া ব্যবসায় তিনি যে দাপট দেখাচ্ছেন তাতে ওখানে তাকে উপাধি দেয়া হয়েছে 2-I.C

শনিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৮

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা- ১৮ - ২১

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা



পাতা: ১৮ - ২১



প্রচ্ছদ বক্তব্য 
        
আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার তাপর্য ও
ছাত্র সমাজের দায়-দায়িত্ব
  -----------------  মিঃ গণমুক্তি

সুদীর্ঘকাল থেকে শিক্ষানবীশদের শোনানো হয়েছে বহু বিশ্রুত শাস্ত্র বাক্য, “ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ”। সংস্কৃতের অমর বাণী। গুরুজনদের প্রিয় মন্ত্র। যার অর্থ অধ্যয়নই ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা। শিক্ষার্থীদেরকে আজো গুরুজনদের কাছ থেকে এই উপদেশ শুনতে হয়।

এমন এক সময় ছিল যেকালে শাস্ত্র অধ্যয়নকে শিক্ষার্থীরা তপস্যা হিসেবে ধরে নিতে পারতো। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের এতটা উন্নতি হয়নি। সেকালে পুঁথিপুস্তক ছিল হাতে গোনা। সেসবই ছিল সে যুগের মনীষীদের চিন্তার ফসল। সেই গুটি কয়েক পুঁথিতে শিষ্যরা নিজেদের মগ্ন রাখতে পারতো। অন্যকিছুতে তাদের মাথা ঘামাবার দরকার পড়তো না। সেকালে সে ধরনের পরিস্থিতিও ছিল না। মানুষের আর্থিক অবস্থা ছিল স্বচ্ছল। জীবন-ধারন ছিল সহজ সরল। কাজেই গুরুগৃহে থেকে শিক্ষার্থীরা নির্ঞ্চাটে বিদ্যা চর্চ্চা করতে পারতো।     
    
তবে, সে যুগেও কেবল শাস্ত্র চর্চ্চাই হতো না। ক্ষত্রিয়দেরকে শাস্ত্রের সাথে অস্ত্রের চর্চ্চা করতে হতো। কারণ সে যুগে যুদ্ধ বিগ্রহে পারদর্শী না হলে কারোর পক্ষে রাজ্য শাসন সম্ভব ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষত্রিয় বা রাজন্যবর্গকে বিদ্যাচর্চ্চার পাশাপাশি শাসনকার্যের কলাকৌশলও রপ্ত করতে হতো। সেকালে রাজা-রাজরাই ছিল সবকিছুর নিয়ন্তা। প্রজাদের উপর রাজত্ব করা ছিল তাদের একচ্ছত্র অধিকার। শাসনকার্য ছিল সাধারণ প্রজাবর্গের কাছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাজেই তাদের সন্তানদের ক্ষত্রিয়দের মতো অস্ত্র শিক্ষা কিংবা শাসনকার্য সম্পর্কে জানার-শেখার প্রয়োজন পড়তো না। রাজ্য জাহান্নামে গেলেও তাদের কিছু করার থাকতো না। অল্প বিস্তর যে বিদ্যা চর্চ্চার সুযোগ হতো, তাকে তপস্যা জ্ঞান করতো।

কালের আবর্তে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সেকালের সাথে আজকের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। সমাজ ব্যবস্থা এখন বহু জটিল। জীবন-জীবিকা অনেক কঠিন। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মানুষকে বেঁচে থাকার আয়োজন করতে হচ্ছে। বিশেষতঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জীবন মানেই সংগ্রাম, বেঁচে থাকা মানে লড়াই করা। দুনিয়ায় এখন মুহুর্তে মুহুর্তে অনেক কিছু ঘটছে। নিত্য-নতুনের উদ্ভব হচ্ছে, আবিস্কার হচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগ এখন আর আগের মত সংকুচিত নয়। এর পরিধি এখন অনেক বেশী বিস্তৃত ও ব্যাপক।

এযুগে তাই শিক্ষা কিংবা বিদ্যাচর্চ্চাকে মান্ধতা আমলের নিরীখে বিচার করার অবকাশ নেই। কিন্তু এখনও অনেকে সেকেলে ভাবধারায় আচ্ছন্ন। সংস্কৃতের সেই পুরানো শাস্ত্র বাক্যকে আঁকড়ে থেকে ভুল অপব্যাখ্যা করছে। ফলে অনেকে ছাত্রদেরকে সংকীর্ণ গ-িতে আবদ্ধ রাখতে চান। বিদ্যাচর্চ্চা বলতে বুঝেন শুধুমাত্র সিলেবাস নির্ধারিত পুঁথিপুস্তক মশগুল থাকা। বাইরের উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ছাত্রদের যে পরিচয় হবার দরকার আছে, তা তারা বুঝতে চান না।

বর্তমান দিনে শিক্ষার অর্থ শুধু পুঁথিপুস্তক গলাধঃকরণ করা নয়। দুনিয়ার ঘটনাবলী থেকে চোখ বুঝে থাকা নয়। আবদ্ধ রুমে চোখ-কান বন্ধ করে বিদ্যাচর্চ্চার অর্থই শিক্ষা নয়।

আজকের দিনে আধুনিক চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থেকে, সংকীর্ণ গ-িতে আবদ্ধ থেকে প্রকৃত অর্থে ছাত্রদের শিক্ষিত হওয়া কিংবা বিদ্যার্চ্চা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক গলাধঃকরণ করে ছাত্রদের অনুসন্ধানী মনের প্রশ্ন মিটতে পারে না, সৃষ্টিশীল প্রতিভারও বিকাশ হতে পারে না।
চিন্তা-চেতনায় সাবালক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য ছাত্রদেরকে অবশ্যই উন্নত আদর্শের সংস্পর্শে আসতে হবে। উন্নত চিন্তা-ভাবনার সাথে পরিচয় হয়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে পড়ার দরকার আছে।

আগেকার দিনে নানান সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার পরিধিকে সীমিত গণ্ডিতে দেখা হতো। উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী মানুষের সেকেলে ধারণাকে বদ্ধমূল করে দেবার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তার কারণও ছিল।

রাডার (বৈসাবি সংখ্যা), পাতা- ১৯

রাডার
হিল লিটারেচার ফোরামের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা
১৩ই এপ্রিল ’৯২
বৈসাবি সংখ্যা



পাতা: ১৯


আমরা শোকাহত

স্বাধীকারহারা ভাগ্যবঞ্চিত জুম্ম জনগণের
মুক্তি সংগ্রামে যে ছিল নিবেদিত প্রাণ,
 মৃত্যুহীন তারুণ্যের মহাশক্তিতে
 যে ভাঙতে চেয়েছিল জরাগ্রস্ত এ সমাজ,
সুবিধাবাদী পদলেহী দালালদের যে ঘৃণা করেছিল আজন্ম,
 অন্যায়-অত্যাচার আর নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে
যে ছিল বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ----                                 
 মিছিলের চেনামুখ,
যার দৃপ্ত পদভারে কেঁপেছিল রাজপথ ----
সে একটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গের নাম
সজীব খীসা। সে আজ আর আমাদের মাঝে নেই।

গত ১২ই জানুয়ারী ৯২ইং, শুক্রবার, রাত পৌনে বারটায় দিঘীনালার বাবুছড়া গ্রামে শচীন্দ্র লাল খীসাকে পুত্র শোকে মুহ্যমান করে সজীব খীসা ১৯ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে হারিয়ে যায়। সে খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র।   তার অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।